বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বি-স্ক্যান এর প্রথম সেমিনার

গত ২ নভেম্বর, ২০১০ তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রতিবন্ধী মানুষের সম্পৃক্তকরণঃ প্রেক্ষিত বাংলাদেশ শীর্ষক সেমিনারটির উদ্যোক্তা ছিলেন বাংলাদেশী সিস্টেমস চেঞ্জ এ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্ক (বি-স্ক্যান)। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি আয়োজিত বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্টিত এই সেমিনারে সার্বিক তত্তাবধানে ছিলেন ব্লগারস ফোরাম।


দুটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশেনের প্রথমটিতে বি-স্ক্যান এর শুরু ও কার্যক্রম তুলে ধরা হয় এবং অপরটিতে দেখানোর চেষ্টা করা হয় কিভাবে তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রুপান্তরিত করা যায়। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি- বাংলাদেশ এর ইংরেজী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং বি-স্ক্যান এর যুগ্ন সচিব সৈয়দা ফারজানা সুলতানা তাঁর চমৎকার উপস্থাপনায় ‘তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রতিবন্ধী মানুষের সম্পৃক্তকরণঃ প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ মুল তথ্য উপস্থাপনসহ অনুষ্টানটি পরিচালনা করেন। এই সময় বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি ও সেমিনারের প্রধান অতিথি জনাব, মোস্তফা জব্বার ও বি-স্ক্যান এর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডাঃ শুভাগত চৌধুরী এবং বি-স্ক্যান এর শুভাকাংখীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে যে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।


তথ্যপ্রযুক্তির যে সমস্ত খাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কাজ করতে পারেন-

ফ্রি-ল্যান্স,ডাটাএন্ট্রি,ওয়েব সাইট ডিজাইন,ওয়েব রিসার্চ, এস ই ও SEO- Search EngineOptimization/Optimizer (the process of improving ranking in searchengine results, it's also used for web marketing.),কল সেন্টারে, কাষ্টমারকেয়ার সার্ভিস সেন্টারে,সাংবাদিক হিসেবে ঘরে বসে কাজ করতে পারে ইন্টারনেটের মাধ্যমে, ফ্যাশন ডিজাইন, ল্যান্ডস্ক্যাপিং,বিল্ডিংড্রয়িং,আর্কিটেকচারাল ড্রয়িং (এসব ট্রেনিং দিলে প্রতিবন্ধীদের জন্য দেশের বাইরে থেকেও অনলাইনভিত্তিক কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করা সম্ভব) এই সকল উদ্যোগের পূর্বশর্ত হচ্ছে সবার আগে প্রতিবন্ধী মানুষের যাতায়াত ও চলাফেরাকে সহজ করা। তারও আগে প্রয়োজন আমাদের মানসিকতা ও আচরণ পরিবর্তন।



বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি ও অন্যান্য সংগঠন যে সব ভুমিকা রাখতে পারে-

প্রথমতঃ আইটি খাতে প্রতিবন্ধী মানুষের সম্পৃক্তকরণ বিষয়ে তারা ক্যাম্পেইন চালাতে পারে। বিভিন্ন মেয়াদি ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করতে পারে- যেমন ৩ মাস, ৬ মাস, ১ বছর।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকুরির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বি-স্ক্যান অন্যান্য সংগঠনের সহায়তা পেলে এই ধরণের উদ্যোগ নিতে পারে।


যারা এই কর্মক্ষেত্রটি তৈরী করতে পারেন-
মোবাইল অপারেটরগণ যেমন গ্রামীণ, বাংলালিঙ্ক, ওয়ারিদ, সিটিসেল পারে তাদের জন্য ট্রেনিং ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে।
বিভিন্ন সংবাদপত্র, বিশেষ করে অনলাইন ভিত্তিক সংবাদপত্রগুলো তাদের কর্ম সংস্থান করতে পারে।
বিভিন্ন টিভি চ্যানেল পারে কর্ম সংস্থানের ব্যাবস্থা করতে।
কল সেন্টারগুলো পারে কর্ম সংস্থান করতে। বি-স্ক্যান এর নির্বাহী সদস্য মোঃ মিলন হাসান তার শিক্ষাজীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা সবাইকে শোনান।


এরপর ১৫ মিনিটের জন্য ফ্লোর ছেড়ে দিলে সংক্ষেপে বিভিন্ন দর্শক যা বলেন-


বুদ্ধী প্রতিবন্ধীদের নিয়ে যারা কাজ করেন সেই ধরণের  কোম্পানির জন্য সফটওয়্যার তৈরী করেন এমন একটি আমেরিকান কোম্পানির একজন বলেন, সেমিনারে যে প্রতিবন্ধকতাগুলোর কথা বলা হয়েছে-যেমন র‍্যাম্প, টয়লেট, লিফট, যাতায়াত ব্যাবস্থা ইত্যাদি সেগুলোর কারণে তারা কর্মসংস্থান করতে পারেন নি এই দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য। তারপরও তাঁরা তাঁদের জন্য নীচতলায় ব্যাবস্থা করে দেবেন। এভাবে যদি অন্যান্য কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসে তাহলে অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।


কম্পিউটার বিজনেস করেন এমন একজন বলেন, প্রতিবন্ধীদের স্কুল পর্যায় থেকে তথ্যপ্রযুক্তিতে আগ্রহী করা তোলা দরকার।  প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের এই বিষয়ে ট্রেনিং দেয়া, এই ক্ষেত্রে সরকার এবং বি-স্ক্যান এর পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।


মিরপুর থেকে আসা একজন দর্শক বলেন- প্রতিবন্ধীরা আমাদেরই একজন এই কথাটি আমরা যদি অনুধাবন করতে পারি তাহলে তাঁদের জন্য সবার পক্ষে কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করা সম্ভব হবে। সরকার বিভিন্ন কোম্পানিকে প্রতিবন্ধীদের চাকরি দিলে যে ট্যাক্স রিবেটের ব্যাবস্থা করার কথা বলেছেন তা মিডিয়াতে প্রচার করা দরকার বলে তিনি মনে করেন।


ব্লগারস ফোরাম থেকে আগত আবু সায়ীদ বলেন, তাঁরা সবসময় বি-স্ক্যানের পাশে আছেন। বি-স্ক্যান যেই কাজে তাদের ডাকবেন তাঁরা সাধ্যমত সেই কাজে পাশে থাকার চেষ্টা করবেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী এবং তাঁর বর্তমান ৪ চারটি চলমান প্রজেক্টে তিনি র‍্যাম্পের ব্যাবস্থা করতে বলে দিয়েছেন এবং টয়লেটের ব্যাবস্থাও করবেন। এ ব্যাপারে তিনি রাজুক ও রিহেবের সাথেও বসবেন।অন্যান্য দর্শকদের মধ্যে একজন বলেন- প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোতে ক্যাম্পেইন করতে।


বি-স্ক্যান এর প্রধান উপদেষ্টা জনাব শুভাগত চৌধুরী বলেন, সুযোগ পেলে তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রতিবন্ধীরা অবদান রাখতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বি-স্ক্যান গ্রুপটির কথা উল্লেখ্য করেন যার জন্ম তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে। মানুষের মাঝে আছে অনন্ত সম্ভবনা, সেই সম্ভবনাকে জাগিয়ে তুলতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। দৃষ্টিভংগী পরিবর্তনের জন্য নিজেকে দিয়ে চিন্তা করার আহ্ববান জানান।


অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জনাব মোস্তফা জব্বার তার বক্তব্যে রাসেল ও লিপি নামে দুজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সাফল্যের কথা তুলে ধরে বলেন প্রতিবন্ধীরা কাজ করতে পারেন না এ কথা একেবারেই ভুল। তথ্যপ্রযুক্তি একটি চমৎকার বিষয় হতে পারে তাদের উন্নয়নে। এতে কাজ করাও সহজ। সাবরিনার কন্ঠে রেকর্ডকৃত প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা চিঠিটি অনুষ্ঠানের প্রথমে শোনানো হয়, পরে জনাব, মোস্তফা জব্বার সাহেব বলেন, সাবরিনার কন্ঠ শুনে তাঁর মনে হয়েছে এখন বিভিন্ন বিখ্যাত বইগুলোর অডিওবুকস তৈরী হচ্ছে, সেখানে তাঁর একটি কাজ হতে পারে। সাবরিনাকে বইটি দেয়া হবে তিনি সেটি রেকর্ডিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে রেকর্ড করে ইমেল করে পাঠিয়ে দেবেন। এভাবে সে রেডিও মিডিয়াতেও কাজ করতে পারেন। যিনি কথা বলতে পারেন না কিন্তু ভাল ছবি আঁকতে পারেন তাঁকে সফটওয়্যার ডেভেল্পমেন্টে কাজ দেয়া যেতে পারে। এমনিভাবে তিনি বেশ কয়েকটি বিভাগের কথা বলেন যা জানা থাকলে তিনি চাকরি দিতে পারেন, ফটোশপ ইলাস্টেটার, ওয়েব ডিজাইন, ফ্লাশ ইত্যাদি। তিনি বিভিন্ন কম্পিউটার ট্রেনিং এ সহায়তা করার কথাও বলেন। চমৎকার একটি বিষয় নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করায় তিনি বি-স্ক্যানকে ধন্যবাদ জানান। পরবর্তীতে মার্চের বিসিএস মেলায় প্রতিবন্ধীদের কর্মক্ষমতার উপর দিনব্যাপী কর্মশালার আয়োজন করার কথা জানান।


এরপর বি-স্ক্যান সদস্য জাহিদুল ইসলাম ঘরে বসে ইন্টানেটের মাধ্যমে আউট সোর্সিং এর কাজ করছেন। সেই বিষয়ে সবাইকে জানান ও আরো কোন কোন দিকে কাজ করা যেতে পারে তা তুলে ধরেন। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সেক্রেটারী জেনারেল মুজিবর রহমান স্বপন তাঁর বক্তব্যে বলেন- আমরা সবাই কোন না কোনভাবে সকলেই প্রতিবন্ধী। পৃথিবীতে একটি মানুষও বলতে পারবেন না তিনি নিখুঁত।


সবশেষে বি-স্ক্যান এর সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ও সুশীল সমাজের নৈতিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন- সুশীল সমাজের নৈতিক দায়িত্ব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আত্মবিশ্বাস তৈরীতে সাহায্য করা এবং তাদের প্রাপ্য অধিকার কে ‘না’ না বলে ‘হাঁ’ বলতে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলা।

1 মন্তব্য(সমূহ):

অরণ্য আনাম said...

বি-স্ক্যান এর পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলন এর সময় এসেছে। তবে তার আগে ঢাকার কয়েকটি স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা সভা করা উচিৎ

Post a Comment

 
Design by Oronno Anam | Bloggerized by Salma Mahbub