বাংলাদেশে অটিজমসহ প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের সময় এসেছে


আমেরিকা থেকে চাইল্ড সাইকোলজিতে মার্স্টাস ডিগ্রিধারী, কানাডায় বসবাসরত সায়মা ওয়াজেদ পুতুল অটিজম শিশুদের চিকিৎসা সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশে অটিজমসহ প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য পলিসি নির্ধারণের সময় এসেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশে এডুকেশন পলিসিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের মানষিক উন্নয়নের পদক্ষেপ ও প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। লার্নিং, হিয়ারিং,ভিজুয়াল, ফিজিক্যাল ডিজাবিলিটি,অটিজম শিশুরা যেন মেইন ষ্ট্রিম শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। কোন ভাবেই যেন এ সুযোগ থেকে ডিজ্যাবল শিশুরা বঞ্চিত না হয়।
গত ৩১ মার্চ বুধবার ম্যানহাটনের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে অটিজম স্পিকস সংগঠনের পক্ষ থেকে বিশ্ব অটিজম এওয়্যারনেস ডে সেমিনার এবং রিশেপশনে অংশ নিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল কানাডা থেকে বুধবার নিউইয়র্কে আসেন। খবর নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক আজকাল।
তিনি এই প্রতিনিধিসহ বাংলা পত্রিকার সম্পাদক আবু তাহের এর সঙ্গে আলোচনায় এ কথা বলেন। সেমিনারে অংশ নেয়ার ফাঁেক এ প্রতিবেদকের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল তার নিজের ৫ বছর বয়সী মেয়ের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানান, সামান্য ‘হুইল চেয়ার কি?’ এটা সে স্কুলে টিচারের কাছে শিখেছে, আর আমি বাসায় শিখিয়েছি। তাই আজ আমার মেয়ে বিষয়টি পরিপূর্ণভাবে জানে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার মাঝে গ্রহণ যোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে। সুতরাং ডিজ্যাবল শিশুরা সমাজ থেকে নিজেদের যেন আইসোলেটেড করে রাখার সুযোগ না পায় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। স্কুলের আধুনিক এডুকেশন এবং সামাজিক ও পারিবারিক রিহ্যাবিলিটেশনই পারবে ৫০ ভাগ ডিজ্যাবল শিশুকে রোগমুক্তি দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্টের অটিজম স্পিকস সংগঠনটি ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিশ্বব্যাপী শিশুদের অটিজম রোগ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বব রাইট এবং সুজান রাইট প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের প্রচেষ্টায় জাতিসংঘ ২০০৭ সালে ২ এপ্রিলকে বিশ্ব অটিজম বা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী সচেতনতা দিবস ঘোষণা করে। এবছর ১ ও ২ এপ্রিল নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন দেশের সুউচ্চ বিল্ডিংয়ে ব্লু লাইট জালিয়ে ওয়ার্ল্ড অটিজম এওয়্যারনেস ডে পালন করা হয়।
গত বুধবার মিড টাউনের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে অটিজম স্পিকস এর পক্ষ থেকে ওয়ার্ল্ড অটিজম এওয়্যারনেস ডে সেমিনার এবং রিসিভশন এর আয়োজন করা হয়। সেমিনারের আলোচনায় দীর্ঘদিন যাবৎ এ বিষয়ে কাজ করে যাওয়া ব্যক্তি ও সংগঠনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ভবিষ্যতে এগিয়ে চলার দিক নির্দেশনা প্রণয়ন করা হয়। এ বছরে জাতিসংঘকে ওয়ার্ল্ড অটিজম এওয়্যারনেস সম্পর্কিত তার ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ প্রদান করা হয়। জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি ড.একে আব্দুল মোমেন রিসিভশনে অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে আসা বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলার ডাঃ প্রাণ গোপাল দত্তও এই সেমিনারে অংশ নেন।
তিনি কীভাবে অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন- এ প্রসঙ্গে সায়মা ওয়াজেদ শিশুর মত সারলতার হাসি বিলিয়ে দিয়ে বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি একজন স্কুল চাইল্ড সাইকোলজিষ্ট। আমার এ্যাসেসম্যান্ট করার জন্য গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের শিশুদের নিয়ে স্কুলে, হাসপাতালে কাজ করেছি। স্পেসালাইজড ট্রেনিংয়ে শিশুদের ইনটেভেনশনের ডিজাইনিংয়ে সহযোগিতা করতে গিয়ে দেখেছি অকুপেশনাল, ফিজিক্যাল থেরাপি সবই আমেরিকায় পাবলিক স্কুলগুলোতে রেগুলার শিশুদের মাঝে রেখেই তাদের মটিভেশন ও শিক্ষা দেয়া হয়। ডিজ্যাবল শিশুদেরকে আলাদা ভাবার সুযোগই দেয়া হয় না।
বাংলাদেশে অটিজম শিশুদের সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিয়ে তিনি বলেন, জানা যায় বর্তমানে দেশে শতকরা ১ ভাগ অটিজম শিশু রয়েছে। পরিবারে শিক্ষা থাকার কারনে শহরে মোটামুটি এই শিশুদের আইডিন্টিফাই করা গেলেও গ্রামে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। অনেকে ‘জ্বিন ভূতের আছর’ বলে ভুল চিকিৎসা করিয়ে শিশুদের ক্ষতি করেন। রোগটি আসলে একটি নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার, যা শিশুর তিন বছর হবার পূর্বেই প্রকাশ পায়। শিশুরা সামাজিক অচরণে দুর্বল হয়, পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কম সক্ষম হয়। মানসিক সীমাবদ্ধতা ও একই কাজ বারবার করার প্রবণতা থেকে তাদের সনাক্ত করা যায়। প্রবাসে থাকলেও দেশের সব খবরই রাখতে হয় আমাকে। আমার অবস্থান থেকেই আমি প্রতিবন্ধীদের সহযোগিতা করে যাব।
আরেক প্রশ্নের জবাবে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বলেন, প্রতিবন্ধী রোগের কারণ সম্পর্কে এখনো কোন পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায়নি। জেনেটিক কারণে এটি হয় বলে কথিত থাকলেও এখনো তা প্রমাণিত নয়। ১৯৪৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোরে অবস্থিত জন হপকিন হাসাপাতালের মনোচিকিৎসক ড.লিও ক্যানার সর্বপ্রথম ১১টি মানসিক ব্যাধিগ্রস্থ শিশুর আক্রমণাত্মক ব্যবহারের সামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন করেন এবং এ ধরণের ব্যাধির নাম দেন ‘আরলি ইনফ্যান্টাইল অটিজম’ বলে তিনি জানান।
তিনি এই রোগ নির্ণয় সম্পর্কে বলেন, এক বা দুই বছর বয়সে শিশুর আচরণে এ রোগের লক্ষণ দেখা দিতে থাকে। অভিভাবকরাই সাধারণত প্রথমে এ রোগের লক্ষণ বুঝতে শুরু করেন। লক্ষণ প্রকাশ পেলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া দরকার বলে তিনি জানান। প্রাথমিকভাবে এসেসম্যান্ট করে সঠিক ডায়াগনসিস করার পর, চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে, শিশুদের স্পিচ ডিলে,ল্যাংগুয়েজ থেরাপি, অকটুপেশনাল থেরাপি বা আঙ্গুলের ব্যবহার, দৌড়ানো, হাঁটার থেরাপি ব্যবহার করে অনেক পরিবার উপকার পেতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন।
এ রোগের গভীরতা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটার কোন কিউর নাই, সর্দি কাশীর মত কোন রোগ না যে, মেডিসিন খেলেই ভাল হয়ে যাবে। আসলে অন্যান্য শিশুদের যদি একবার কোন কিছু দেখাতে হয় তবে অটিজম শিশুদের বারবার তা দেখিয়ে শেখাতে হয়। এই শিশুদের ইন্ডিপেন্ডন্ট কিভাবে হতে হয় তা শিখাতে হবে ধৈর্য নিয়ে। কাপড় পড়া, জামার বোতাম লাগানো শেখাতে হয়তো দশ বা বিশবার।
তিনি বলেন, শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যত, অটিজম আক্রান্ত শিশুরা সঠিক পরিচর্যা, সামাজিক সচেতনতায় অকটু ভালবাসা, স্নেহ পেলে হয়তো দেখা যাবে, একদিন তারা আমাদের দেশ ও জাতির জন্যে গৌরব বয়ে নিয়ে আসবে।

লেখকঃ মোহাম্মদ সাঈদ, নতুন দেশ
http://www.notundesh.com/onnoghor_news1.html

0 মন্তব্য(সমূহ):

Post a Comment

 
Design by Oronno Anam | Bloggerized by Salma Mahbub